Diabetic retinopath , Dr Mowla

ডায়াবেটিস হলে কখন চোখের রেটিনা পরীক্ষা করাবেন?

ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করা বাড়ায় না; এটি ধীরে ধীরে চোখের রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই সমস্যাকে বলা হয় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রেটিনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি শুরু হলেও প্রথমদিকে রোগীর দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক থাকতে পারে। তাই চোখে ঝাপসা দেখা শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে নির্দিষ্ট সময় পরপর রেটিনা পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি কী?

রেটিনা হলো চোখের ভেতরের আলো-সংবেদনশীল পর্দা, যা ছবি গ্রহণ করে মস্তিষ্কে পাঠায়। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে রেটিনার রক্তনালি থেকে রক্ত বা তরল বের হতে পারে, রক্তনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা অস্বাভাবিক নতুন রক্তনালি তৈরি হতে পারে।

রোগটি অগ্রসর হলে দেখা দিতে পারে:

  • ডায়াবেটিক ম্যাকুলার এডিমা বা ম্যাকুলায় পানি জমা
  • চোখের ভেতর রক্তক্ষরণ
  • রেটিনায় টান সৃষ্টি
  • ট্র্যাকশনাল রেটিনাল ডিটাচমেন্ট
  • স্থায়ী দৃষ্টিহানি
  • Diabetic retinopath , Dr Mowla
    Retina of diabetic – diabetic retinophaty

টাইপ ডায়াবেটিস হলে কখন প্রথম পরীক্ষা করবেন?

টাইপ ডায়াবেটিস ধরা পড়ার সময়ই একটি পূর্ণাঙ্গ রেটিনা পরীক্ষা করানো উচিত।

কারণ অনেকের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের কয়েক বছর আগেই ডায়াবেটিস শুরু হয়ে থাকতে পারে। ফলে ডায়াবেটিস প্রথম শনাক্ত হওয়ার সময় চোখে রেটিনোপ্যাথি উপস্থিত থাকতে পারে।

টাইপ ডায়াবেটিস হলে কখন পরীক্ষা করবেন?

টাইপ ১ ডায়াবেটিসে সাধারণত রোগ শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ রেটিনা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর রোগীর বয়স, ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ এবং রেটিনার অবস্থার ভিত্তিতে পরবর্তী পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করা হয়।

 

American Diabetes Association-এর ২০২৬ Standards of Care এবং American Academy of Ophthalmology-এর Diabetic Retinopathy Preferred Practice Pattern : Source

 

কতদিন পরপর রেটিনা পরীক্ষা প্রয়োজন?

সাধারণ নির্দেশনা হলো:

  • রেটিনোপ্যাথি না থাকলে সাধারণত বছরে একবার পরীক্ষা
  • একাধিক পরীক্ষায় রেটিনা স্বাভাবিক এবং ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে এক থেকে দুই বছর পরপর
  • রেটিনোপ্যাথি পাওয়া গেলে অন্তত বছরে একবার অথবা আরও ঘন ঘন
  • ম্যাকুলার এডিমা, গুরুতর রেটিনোপ্যাথি বা নতুন রক্তনালি থাকলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পরপর মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে

পরীক্ষার ব্যবধান সবার জন্য এক নয়। রেটিনার অবস্থা, HbA1c, রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা এবং গর্ভাবস্থার মতো বিষয় বিবেচনা করে রেটিনা বিশেষজ্ঞ সময় নির্ধারণ করেন।

চোখে ভালো দেখলেও কি পরীক্ষা প্রয়োজন?

হ্যাঁ।

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না। দৃষ্টি কমে যাওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করা গেলে পর্যবেক্ষণ, রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, লেজার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী চোখে ইনজেকশনের মাধ্যমে দৃষ্টিহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো দৃষ্টির জন্য বিপজ্জনক রোগ দ্রুত শনাক্ত করে সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি করা।
সূত্র: WHO Diabetic Retinopathy Screening Guide

কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে নির্ধারিত বার্ষিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা রেটিনা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:

  • হঠাৎ ঝাপসা দেখা
  • চোখের সামনে কালো বিন্দু বা জালের মতো ছায়া
  • হঠাৎ অনেক ফ্লোটার দেখা
  • দৃষ্টির কোনো অংশে পর্দা বা ছায়া নেমে আসা
  • সোজা লাইন বাঁকা দেখা
  • এক চোখে হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া
  • রাতে দেখতে অসুবিধা বৃদ্ধি পাওয়া

হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া বা পর্দার মতো ছায়া দেখা জরুরি অবস্থার লক্ষণ হতে পারে।

রেটিনা পরীক্ষায় কী করা হয়?

একটি পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিক চোখের পরীক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী থাকতে পারে:

  1. দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা
  2. চোখের চাপ পরিমাপ
  3. ড্রপ দিয়ে চোখের মণি বড় করে রেটিনা পরীক্ষা
  4. কালার ফান্ডাস ফটোগ্রাফি
  5. ম্যাকুলার OCT
  6. প্রয়োজন হলে ফান্ডাস ফ্লুরোসিন এনজিওগ্রাফি বা OCTA

ফান্ডাস ফটোগ্রাফি স্ক্রিনিংয়ে সহায়ক হলেও অস্বাভাবিক ফল পাওয়া গেলে বা ছবি পরিষ্কার না হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের সরাসরি পরীক্ষা প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় বিশেষ সতর্কতা

আগে থেকেই টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস আছে—এমন নারী গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলে গর্ভধারণের আগে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। তা সম্ভব না হলে প্রথম তিন মাসের মধ্যেই পরীক্ষা প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। তাই রেটিনার অবস্থা অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের পর ঘন ঘন ফলোআপ লাগতে পারে।

দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় রোগী কী করবেন?

  • চিকিৎসকের লক্ষ্য অনুযায়ী রক্তে শর্করা ও HbA1c নিয়ন্ত্রণ করুন
  • রক্তচাপ ও রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখুন
  • কিডনির কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করুন
  • ধূমপান পরিহার করুন
  • চোখে ভালো দেখলেও নিয়মিত রেটিনা পরীক্ষা করান
  • লেজার বা ইনজেকশনের ফলোআপ বাদ দেবেন না

হঠাৎ দৃষ্টি পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন

 

Frequently Asked Questions

শুধু চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করলেই কি রেটিনা পরীক্ষা হয়ে যায়?

না। চশমার পাওয়ার পরীক্ষা চোখের দৃষ্টিশক্তি মূল্যায়ন করে। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শনাক্ত করতে ড্রপ দিয়ে মণি বড় করে রেটিনা পরীক্ষা অথবা উপযুক্ত retinal imaging প্রয়োজন।

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হলে কি সবাই অন্ধ হয়ে যান?

না। সময়মতো শনাক্তকরণ, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনজেকশন, লেজার বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক রোগীর দৃষ্টি রক্ষা করা সম্ভব।

একবার পরীক্ষা স্বাভাবিক হলে কি আর পরীক্ষা লাগবে না?

লাগবে। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি পরবর্তী সময়ে তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী নিয়মিত পুনরায় পরীক্ষা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি কি শুধু বেশি বয়সে হয়?

না। ডায়াবেটিসের ধরন, স্থায়িত্ব, নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও গর্ভাবস্থাসহ বিভিন্ন কারণে কম বয়সেও এটি দেখা দিতে পারে।

 

ডা. মো. মাকসুদে মাওলা
MBBS, BCS (Health), MCPS, FCPS (Eye), ICO (London)
চক্ষু বিশেষজ্ঞ, রেটিনা ও ফ্যাকো সার্জন
ভিট্রিও-রেটিনা ফেলো, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল